২৮০০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্যে ইইউর পাল্টা শুল্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধে দমল না ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধে দমল না ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বরং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। এর আওতায় পড়বে ২ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো বা ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য। গতকাল ইউরোপীয় কমিশনের দেয়া ঘোষণাটি চলমান বাণিজ্যযুদ্ধকে আরো উসকে দিয়েছে, যা এরই মধ্যে আর্থিক বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। খবর রয়টার্স ও এফটি।

অবশ্য বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সরে আসতে এখনো আশাবাদী ইউরোপীয় কমিশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এখনো আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে।

গতকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক প্রযোজ্য হচ্ছে। এর মাধ্যমে আগে দেয়া শুল্ক অব্যাহতি, শুল্কমুক্ত কোটাসহ বিভিন্ন পণ্যের ছাড়পত্রের মেয়াদ ফুরিয়ে গেল। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহকারী কানাডা। এরপর রয়েছে ব্রাজিল, মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া।

ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, তারা আগামী ১ এপ্রিল থেকে মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের বর্তমান স্থগিতাদেশ বাতিল করবে এবং ১৩ এপ্রিলের মধ্যে সম্পূর্ণ শুল্ক কার্যকর হবে। স্থগিতাদেশ তুলে নেয়া বিভাগে রয়েছে নৌযান থেকে হুইস্কি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য।

ইইউ জানিয়েছে, নতুন এ পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন নতুন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যের সমতুল্য প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ‘আমাদের নেয়া পাল্টা পদক্ষেপ শক্তিশালী, তবে আনুপাতিকভাবে যথাযথ। যুক্তরাষ্ট্র ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপ করায় আমরা ২ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্যে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত। আমরা বিশ্বাস করি যে ভূ-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভরা এ বিশ্বে এমন শুল্ক কারো স্বার্থ রক্ষা করবে না। আমরা অর্থবহ সংলাপের জন্য প্রস্তুত।’

সঙ্গে যোগ করেন, ‘আরোপিত শুল্ক সরবরাহ চেইন ব্যাহত ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। চাকরি হুমকির মুখে পড়ছে। পণ্যের মূল্য বাড়বে।’ একই সঙ্গে ‘ইইউ অবশ্যই নিজেদের ভোক্তা ও ব্যবসার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে’ বলে জোরালো মন্তব্য করেন উরসুলা ফন ডার লিয়েন।

নতুন পাল্টা শুল্কে লক্ষ্য হতে যাচ্ছে শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য। এর মধ্যে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল, গৃহস্থালি সামগ্রী, প্লাস্টিক, পোলট্রি, গরুর মাংস, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য, চিনি ও সবজির মতো পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া আগামী দুই সপ্তাহে আরো কিছু পণ্য যুক্ত হবে।

সুরক্ষামূলক বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাধা অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যার প্রভাব এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে পড়া শুরু হয়েছে। এর আগে চীন ও কানাডা পাল্টা শুল্ক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। আবার ভারতের মতো কিছু দেশ আগাম ছাড় দিয়েও সুরক্ষা পাচ্ছে না।

ট্রাম্প গত মাসে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো বাতিল হয়ে যায়। ওই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি পেত।

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ‘বিদেশী প্রতিদ্বন্দ্বীরা’ মার্কিন বাজারে ধাতুপণ্য রফতানি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় উৎপাদকরা।

ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্প শুল্ক আরো বিস্তৃত করেছেন। এতে টেনিস র‍্যাকেট, ব্যায়ামে ব্যবহৃত বাইক, আসবাব ও এয়ার কন্ডিশনারের মতো পণ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এসব সিদ্ধান্তের তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ শুল্ক আরোপের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং আমাদের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের চেতনার পরিপন্থী।’

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অস্ট্রেলিয়া শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছিল। কারণ দেশটির ইস্পাত উৎপাদকরা মার্কিন প্রতিরক্ষা ও উৎপাদন খাতে সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে।

আইনি সংস্থা সিডলি অস্টিনের অংশীদার টেড মারফি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ব্যবস্থা ২০১৮ সালের তুলনায় অনেক বড় পরিবর্তন। আগে মার্কিন সরকার কিছু পণ্যকে শুল্ক থেকে ছাড় দিয়েছিল, যা দেশে সহজলভ্য ছিল না। এখন এই ছাড় প্রত্যাহার করায় অনেককে বাড়তি শুল্ক দিতে হবে। কারণ তারা মার্কিন বাজারে এ পণ্যগুলো উৎপাদন করতে পারছে না।’

এর আগে মঙ্গলবার শীর্ষ তিন বাণিজ্যিক সহযোগীর একটি কানাডা থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। পরদিন এ সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেন। অন্যদিকে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রফতানির ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়ে পরদিন স্থগিত করে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ।

আরও